শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:০২ অপরাহ্ন

কৃষকের কোনটা প্রয়োজন; প্রণোদনা নাকি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য: মোমিন উদ দৌলা

mm
আধুনিক কৃষি খামার থেকে নেওয়াঃ-
  • আপডেট সময় বুধবার ৫ আগস্ট, ২০২০
  • ১৫৮বার পঠিত


এগ্রিকালচার বা কৃষি বলতে আমরা অনেকেই ধান, গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য ক্রপ প্রোডাকশনকে বুঝি। কৃষি যে শুধুমাত্র ক্রপ প্রোডাকশন তা কিন্তু নয় এর সাথে জড়িত আছে মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, পোল্ট্রি পালনসহ অন্যান্য খাত গুলো। এগুলো সবই কিন্তু কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরিগেশনের জন্য সরকার যেমন কৃষিখাতে ভতুর্কীসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেয় সেক্ষেত্রে কিন্তু মৎস্য চাষ, গরুর খামার, ছাগলের খামার, পোল্ট্রি পালনসহ অন্যান্য খাতে সে অর্থে কোন প্রণোদনা দেয়া হয়না।
সরকার কৃষিখাতের ক্রপ প্রোডাকশনকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে আসলেও প্রাণিজ প্রোটিন উৎসের খাতগুলো বরাবরই উপেক্ষিত থাকছে। ফলে প্রাণিসম্পদ সেক্টর বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে এই খাতগুলোর অবদান অনেক বেশি অথচ বরাবরই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে এদেশের ডেইরি, মৎস্য, পোল্ট্রিসহ প্রাণিসম্পদের অন্যান্য খাতসমূহ। বর্তমান সময়ে কৃষিখাত একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। কৃষিখাত বিশেষ করে আমাদের শর্করা অর্থাৎ ভাতের চাহিদা মেটায়। শুধুমাত্র এই ভাত দিয়ে আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটেনা। এর সাথে শাক-সবজিসহ প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিনও দরকার। আর এই প্রোটিনের মুল উৎস্য হল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত।

আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের প্রায় পুরোটা যোগানই আসে দেশের  মৎস ও প্রাণী সম্পদ খাত থেকে। কিন্তু বরাবরই এই খাতগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে কিংবা ততটা গুরুত্ব দেয়া হয়না। তাই, এই খাতগুলোর সে অর্থে তেমন কোন উন্নয়ন সাধিত হচ্ছেনা। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ব্যাহত হচ্ছে প্রাণিজ প্রোটিনের কাঙ্ক্ষিত যোগান ও উৎপাদন। সরকারিভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ কৃষিখাতে যেসব প্রণোদনা ও ভতুর্কি দেওয়া হয় তার সম্পূর্ণ ইমপ্যাক্ট ফার্মিং কমিউনিটিতে পড়েনা। ফার্মিং কমিউনিটিতে কখনই এসব যথাযথভাবে পৌছায়না। এদিকে সরকারের এই প্রণোদনা বন্টনে যে অনিয়ম গুলো সংগঠিত হয় এর ফলে পুরো প্রণোদনা কার্যক্রমটাই একটি শো ডাউনে পরিণত হয়। কিছুসংখ্যক কৃষক হয়তোবা এই প্রণোদনা ও সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাগুলো ভোগ করে থাকে কিন্তু অধিকাংশ কৃষকই এসব থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। ফলে কৃষক শ্রেণী লাভবান তো হয়ই না বরং আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা প্রণোদনা গুলো যদি গ্লোবালি দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, পাশ্চাত্যের দেশগুলো কৃষকদের কল্যাণে কাজ করে। পাশ্চাত্যের দেশ গুলোর সরকার প্রতিটি সিদ্ধান্তই কৃষকের অনুকূলে নিয়ে থাকে এবং তারা সেটা গুরুত্ব সহকারে মনিটর করে থাকে। তারা সব সময় চাষিদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা হয়না। কৃষকরা যে বিনিয়োগ করে, কায়িক পরিশ্রম করে পণ্য উৎপাদিত করে সে যেন পণ্য বিক্রি করে লাভবান হতে পারে সেটা আমাদের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষকরা যাতে কোনভাবে হতাশ না হয়ে পড়ে সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি কৃষক যেন দ্বিগুণ উৎসাহে কৃষিকাজের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠে সেজন্য সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে তাদের পণ্য ন্যায্য দামে কিনে স্টকে রাখতে হবে। এতে করে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা ফলে সামগ্রিক উৎপাদন বেড়ে যাবে যার দরূন সব শ্রেণীই উপকৃত হবে।

কৃষকরা যেন কৃষিকাজে আরও উৎসাহিত হয় সেজন্য সরকারকে বিভিন্ন পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে হবে। কৃষক থেকে শুরু করে এই খাত সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটা কিভাবে তৈরি হবে তা নিয়ে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। সরকার চাইলে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে মার্কেট ম্যাকানিজম নিয়ে কাজ করতে পারে।

এছাড়াও ভ্যালু এডেড প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, ধানের ক্ষেত্রে যারা রাইচ মিলের ব্যবসা করেন অর্থাৎ ধান থেকে রাইচ প্রোসেস করে তাদের জন্য একটি টেকসই নীতিমালা গ্রহণ করতে পারে। রাইচ মিল মালিকরা কি দামে কিনবে, কিংবা কি পরিমাণ ধান কিনতে পারবে তা সরকারকে ঠিক করে দিতে হবে। প্রতি বছর সরকারকে কস্ট ডিমান্ড এর উপর একটা স্ট্যান্ডার্ড দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে যাতে করে মিল মালিকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে না পারে। এতে করে মিল মালিকরা নিজেদের একটা ন্যায্য মুনাফা রেখে তা মার্কেটে বিক্রি করবে। ফলস্বরূপ, কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবাই এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

ধান হারভেস্টের সময় প্রচুর ধান আসে যা গোলায় রাখার মত জায়গা থাকেনা। ফলে তাড়াতাড়ি বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক ন্যায্য দাম পায়না, এতে করে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি নিজের পুঁজি হারিয়ে ঘর বাড়ি কিংবা জমি জমা বিক্রি করে দিতে হয়। তাই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা জরুরী।

এদিকে দুধ, ডিম কিংবা মুরগির ক্ষেত্রে দেখা যায় সবসময় মধ্যসত্ত্বভোগীরা লাভবান হয়। ফার্মাররা উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ করে সেই অনুপাতে তারা লাভবান হতে পারেনা। কমজুমাররা যে খুব কম দামে পণ্য ক্রয় করে তা কিন্তু নয় বরং প্রায়ই উচ্চমূল্যে কিনে থাকে। ফার্ম প্রাইস ও কনজুমার প্রাইসের মাঝে ২০০-৫০০% মুনাফার ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। এত বিপুল পরিমাণ মুনাফা লাভ করে মধ্যসত্ত্বভোগীরা। অথচ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একজন খামারি তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায়না ফলে তারা বঞ্চিত থেকেই যাচ্ছে। এখানে একজন কনজ্যুমার ও কৃষক দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক ও কনজ্যুমার মাঝে যে মধ্যস্বত্তভোগী থাকে এদের কে নিয়ন্ত্রণ করাটা অত্যন্ত জরুরী। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই এই শ্রেণীটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে হতাশার কথা এই জায়গায় সরকারের তেমন কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

সরকার যখন প্রণোদনা ঘোষণা করে সেসময় মনে হয় যে সবাই লাভবান হবে, আসলে তেমনটা হয়না। প্রণোদনা ঘোষণা কিংবা ভতুর্কী দেয়ার আগে ভোক্তা ও কৃষকের মাঝে যে মূল্য বৈষম্য তা দূর করার জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে। প্রণোদনা দেয়ার থেকে মূল বিষয় হল কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মুল্য নিশ্চিত করা। দেশের ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন তখনই সম্ভব হবে যখন দেশের কৃষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মুল্য নিশ্চিত করা যাবে। আর এটি করা সম্ভব হলেই কৃষক কিংবা খামারির মুখে হাসি ফুটবে যার ফলে কৃষির সকল উপখাতসমূহ স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে এই দেশ সত্যিকার অর্থে একটি সোনার দেশ হয়ে উঠবে।

সুত্রঃ- আধুনিক কৃষিখামার.কম


এ জাতীয় আরো খবর..