মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন

কক্সবাজারে এক মাসে ৩টি হাতির মৃত্যু: থামানো যাচ্ছে না হাতি হত্যা

mm
মো. সাইফুল ইসলাম খোকন, কক্সবাজারঃ
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৫৫বার পঠিত



কক্সবাজারে একের পর এক হাতির মৃত্যু হচ্ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ বসতি, হাতি চলাচলের করিডোর বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, ফসল রক্ষায় বিদ্যুৎ শক, ইটভাটা, আবাস স্থল উজাড় ও খাবার সংকটের কারণে এমনটা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বনো হাতি পাহাড় থেকে খাবারের খোঁজে লোকালয়ে এসে একের পর এক মারা পড়ছে।

তবে বুনো হাতির এ মৃত্যু থামার কোন উদ্যোগ নেই। সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বুনো হাতির মৃত্যুর তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশ সচেতন মহল। সংরক্ষিত পাহাড়ি জনপদে বিচরণকারী হাতির সুরক্ষায় অভায়রণ্য গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

জানা গেছে, চলতি ডিসেম্বর মাসেই কক্সবাজার জেলায় ৩টি হাতি মারা গেছে। এ নিয়ে গত দুই বছরে মারা গেছে ১৪টি এশিয়ান বন্যহাতি। এ নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তারা বলছেন, বন উজাড় করে নিত্যনতুন ঘরবাড়ি. রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে হাতির আবাসস্থল উজাড়, চলাচলের করিডরে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ ও খাদ্য সংকটে পড়েছে হাতিরা। ফলে প্রায় সময় লোকালয়ে হানা দেয় বন্যহাতির দল। এ কারণে ফসল রক্ষায় ক্ষতিপয় ব্যক্তিরা বিদ্যুৎ শক ও গুলি ও খাবারে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হচ্ছে হাতিদের। আবার চোরা শিকারিরাও দাঁত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের লোভে বন্য হাতিকে হত্যা করে। অনেক সময় এলাকাবাসীর ক্ষেতের ফসল রক্ষায় বৈদ্যুতিক ফাঁদ তৈরি করে। সেই বিদ্যুতের পাতা ফাঁদে পড়ে হাতির মৃত্যু ঘটছে। ফলে মানুষ ও হাতির মধ্যে এক প্রকার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।

হাতির মরদেহ উদ্ধারের পর সেটির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে বন বিভাগ ও পুলিশ। থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি হয়। প্রাণিসম্পদ বিভাগ ময়নাতদন্তের জন্য ফুসফুস, পাকস্থলীসহ কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে। খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মারা যেতে পারে। বুনো হাতির মৃত্যুর পরের কাহিনী প্রায় একই গল্পে তৈরি। ময়নতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

প্রাণী সম্পদ বিভাগ জানায়, কক্সবাজার জেলায় রয়েছে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল বুনো হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর নিরাপদ আবাস। কিন্তু গত ১০ বছরে এই আবাসস্থল ধ্বংসের অংশ হিসেবে গাছ কাটা, পাহাড় সাবাড় এবং সংরক্ষিত বন দখলে নিয়ে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে অবৈধ ইটভাটা, শত শত বাড়িঘর। ফলে বনের নিরাপদ আবাস হারিয়ে হাতির পাল ঘন ঘন নেমে আসছে লোকালয়ে।

বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী, বুনো হাতি হত্যা করলে দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। আর হাতির আক্রমণে নিহত হলে সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহত হলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পেলেও বুনো হাতি হত্যার ঘটনায় সাজার কোনো তথ্য নেই।

সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের একাধিক সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ে বনের জমি জবরদখল করে অবৈধ বসতি স্থাপন করার কারণে বুনো হাতির আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। এতে পাহাড় ও বন ধ্বংসের পাশাপাশি হাতিসহ বন্য প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পথ নষ্ট হচ্ছে। জবরদখলকারীরা বিভিন্নভাবে প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় তাদের উচ্ছেদও করা যাচ্ছে না। অবৈধ বসতি ও জবরদখলকারীদের উচ্ছেদ করা না গেলে এখানকার বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কঠিন হবে।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি সময়ে বুনো হাতির চলাচলের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আগে ২৫-৩০টি হাতি একত্রে দল বেঁধে চলাফেরা করত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, একটি-দুটি হাতি দলছুট হয়ে চলাফেরা করছে। এতে ঝুঁকি বাড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাসের মো: ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, কক্সবাজারে বিভিন্ন এলাকায় হাতি সহ বন্যপ্রাণী হত্যার বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন মানব সৃষ্ট কারণে এসব হাতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে অবিরত। ফলে তাদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বন ভূমি থেকে জবর দখলকারীদের উচ্ছেদ করে,দ্রুত বন সৃজন করা না গেলে বন্য প্রাণী রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না।

তিনি আরো জানান, আগের মত হাতি দেশে নেই বললে চলে। বর্তমানে যাহ আছে তা অপ্রতুল। হাতির বংশ বিস্তার জরুরী। হাতি এখন মহাবিপন্ন। এ মুহুর্তে হাতি সংরক্ষণ করতে না পারলে দ্রুত সময়ে হাতি বিলুপ্তি হতে পারে। হাতি হত্যা কারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ জরুরী। তিনি সংশ্লিষ্টদের নিজ দায়িত্ব থেকে হাতি হত্যা রোধ করতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন।

শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..