রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ০৯:৫৬ অপরাহ্ন

বেরোবির শিক্ষার্থীদের ফাঁসাতে শিক্ষিকা তাসনীম হুমাইদার নাটক

mm
একরামুল ইসলাম,পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় শনিবার ১৭ এপ্রিল, ২০২১
  • ২৬২বার পঠিত
বেরোবির শিক্ষার্থীদের ফাঁসাতে শিক্ষিকা তাসনীম হুমাইদার নাটক ছবি ফাইল

শিক্ষার্থীদের ফাঁসাতে অভিনব প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসনীম হুমাইদা এবং তার স্বামী রাজুর বিরুদ্ধে।তারা দুজন মিলে গত সোমবার(১২ই এপ্রিল)বাসায় ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক বিভাগের নারী শিক্ষার্থী রাহাতুল জান্নাতের ফোন কেড়ে নেয় এবং ফোনের লক খুলে ল্যাপটপের সাথে কানেক্ট করে ডাটা চুরি করে,পাশাপাশি জান্নাতকে ম্যাসেঞ্জারে তার(তাসনীম হুমাইদার)পাঠানো বিভিন্ন কথোপকথন ডিলেট করেন।

এবং এর পরদিন(১৩ই এপ্রিল,মঙ্গলবার)নিজেই ফেসবুকের ভুয়া মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট খুলে তাকে ফাসানোর চেষ্টার অভিযোগ এনে বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল তোফায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এ বিষয়ের প্রতিকার চেয়ে একই বিভাগের ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল এবং রাহাতুল জান্নাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড.নজরুল ইসলাম বরাবর আলাদা আলাদাভাবে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

লিখিত অভিযোগে,২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের রাহাতুল জান্নাত অভিযোগ করেন,গত ৭ই এপ্রিল বিকেলে তাসনীম ম্যাম আমাকে তার বাসায় যেতে বলেন। আমি আমাদের ব্যাচের আর একজন সিআর সাজেদুলকে বা অন্য কাউকে সাথে নিতে চাইলে তিনি নিষেধ করেন একাই যেতে বলেন। আমি তার বাসায় দুই ঘন্টারও বেশি সময় ধরে অবস্থান করি। তিনি আমার ফোন থেকে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার চেক করেন। ফেসবুকের একটি আইডি থেকে অজ্ঞাতপরিচয় টিচারদের উদ্দেশ্য দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস সম্পর্কে তার দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন।

ওই সময় তিনি আমাকে আদেশ করেন বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল ভাইয়া এবং বিভাগের শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধান স্যারকে কল দেয়ার জন্য। ম্যামের কথা মতো আমি তাদের কল দিয়েছিলাম কিন্তু রিসিভ না করায় কোন কথা হয় নি। সেসময় তিনি আমাকে অনেক কথা বলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। সেদিন সন্ধ্যায় আমি তার বাসা থেকে চলে আসি। আসার আগে ম্যাম আমাকে এসব ঘটনা কারো সাথে শেয়ার না করার জন্য বলেন এবং আমার বাসাতেও জানাতে না করেন। লিখিত অভিযোগে আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল জানান, জনাব তাসনীম হুমাইদা গত ৫ এপ্রিল ২০২১ তারিখে নিজেই তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলেন তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে।

এছাড়াও তিনি প্রথম বর্ষের সিআর রাহাতুল জান্নাতকেও ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক গ্রুপে একটি স্ট্যাটাস দিতে বলেন। এছাড়াও বেশ কয়েকজন ব্যাক্তি তাসনীম হুমাইদার আইডি হ্যাক হওয়া সংক্রান্ত স্ট্যাটাস দেন। অথচ তিনি এখন এসে অভিযোগ করছেন আমি তার নামে ভুয়া মেসেঞ্জার খুলে টাকা তোলার কথা বলেছি এবং একজন শিক্ষকের রেফারেন্স দিয়ে একজন জুনিয়র শিক্ষার্থীকে কাজটি করতে বাধ্য করেছি। তার অসংলগ্ন কাজকর্ম এবং লিখিত অভিযোগের অসঙ্গতিপূর্ণ কথাই প্রমান করে দেয় যে এটা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ।

একজন শিক্ষকের এমন হীন ষড়যন্ত্র আমাকে গভীরভাবে ব্যতীত করেছে। লিখিত অভিযোগে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে, অভিযোগকারী শিক্ষক তাসনীম হুমাইদা আমার সাথে ক্লাসরুম, পরীক্ষার হল এমনকি ক্যাম্পাসে হয়রানিমূলক আচরণ প্রদর্শন করেন ও আমাকে দেখে বারংবার নেওয়ার হুমকি দেন। ২০১৯ সালের মে মাসে তিনি বিভাগীয় প্রধান থাকাকালীন বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, তাকে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় বঞ্চিত করা হয়েছে, এ বিষয়ে নিউজ করার জন্য।

এ সময় আমি বিনয়ের সাথে জানতে চাই, ম্যাম আপনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ২ মাস আগে, তাহলে এখন কিভাবে প্রতিবাদ করা যায়, তাছাড়া আপনি দায়িত্ব না নিয়ে প্রতিবাদ করতে পারতেন। এমন প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন এবং বিভাগীয় প্রধানের কক্ষ হতে বের হয়ে যেতে বলেন। খোজ নিয়ে জানা যায়,অভিযোগকারী এই শিক্ষক বিভাগে নিয়মিত অনিয়ম করে যাচ্ছেন।২০১৫-১৬শিক্ষাবর্ষের ৬ষ্ট সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১বছর পর তিনি মিড সেমিস্টার এবং ইনকোর্স পরীক্ষা গ্রহণ করেন।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষা ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে সম্পন্ন হলেও ২০২১সালের উক্ত ব্যাচের মিড সেমিস্টার পরীক্ষা গ্রহণ করেন যার ফলশ্রুতিতে উক্ত ব্যাচের ফলাফল প্রদানে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ২০১৯-২০ শিক্ষবর্ষের ১ম বর্ষ ১ম সেমিস্টারের একটি কোর্সে কোন ক্লাস না নিয়ে ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করেন। তাসনীম হুমাইদা কখনো কোন ব্যাচের সেমিস্টারের শুরুতে ক্লাস নেন না। বেশিরভাগ সময় সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি করে ৪/৫ ক্লাস নিয়ে ক্লাস শেষ করেন, এমনও হয়েছে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় ক্লাস নিয়ে কোন রকম কোর্স শেষ করেছেন। অথচ সেই সেমিস্টারও ৮/৯ মাসে শেষ হয়েছে।

ক্লাস সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ২৫-৩০ মিনিটের একটি ক্লাসে ২টি এটেনডেন্স গ্রহণ করেন। অধিকাংশ সময় তিনি (জনাব তাসনীম হুমাইদা) অ্যাসাইনমেন্ট প্রেজেন্টেশন না নিয়েই গড় নাম্বার দিয়ে থাকেন। নয় মাস হয়ে গেলেও একটি ব্যাচের ক্লাস শুরু না করার কারণে ইতিপূর্বে একটি জাতীয় পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উক্ত ব্যাচের সেই কোর্সে ক্লাস নেবেন না বলে শিক্ষার্থীদের হুমকি প্রদান করেন। জনাব তাসনীম হুমাইদার বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ ওপেন সিক্রেট হলেও ভয় ও আতংকে কোন শিক্ষার্থীই মুখ খুলতে সাহস করে না।

এসব বিষয়ে জানতে উক্ত নারী শিক্ষার্থীকে ফোন করা হলে তিনি জানান, তাকে কোট করে তাসনীম হুমাইদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে যে অভিযোগ দায়ের করেছেন তার সবই মিথ্যা বানোয়াট। তিনি আরও জানান, তার নাম ব্যবহার করে এধরণের মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে,বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এবং বিভাগীয় প্রধান বরাবর লিখিত দিচ্ছেন। তিনি জানান তাসনীম হুমাইদা তার অভিযোগে যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছেন তারা কখনোই তাকে এধরণের কোন কাজ করতে বলেননি।

জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল জানান,বিভাগের ১ম বর্ষের একজন শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে আমার বিরুদ্ধে তাসনীম হুমাইদা যে সকল অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ কাল্পনাপ্রসূত, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমি মনে করি আমার প্রতি তার ব্যাক্তি আক্রোশের ফল হিসেবে তিনি এটি করেছন। এ ঘটনার সাথে আমার নূন্যতম কোন সম্পৃক্ততা নেই।

এমনকি ওই শিক্ষার্থীর সাথে আমি কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি সে আমার সম্পর্কে এমন কোন কথা তাসনীম হুমাইদাকে বলে নি। একজন শিক্ষার্থী কে বাসায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনীম হুমাইদা জানান,শিক্ষক হিসাবে তিনি তার শিক্ষার্থী কে বাসায় ডাকতে পারেন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠার সুযোগ নেই।

এ সময় তিনি আরও জানান,আমি ওই শিক্ষার্থীকে বলি,সে যেনো তার মা-বাবা,ভাই বোন এমনকি তার কোন একজন সহপাঠী কে নিয়ে আসে।কিন্ত সে তা না করে একা আমার বাসায় আসে।তবে এ সময় তার স্বামী বাসায় থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই কক্ষে ছিলেন না।

গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড.নজরুল ইসলাম,অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।এ সময় তিনি জানান,একাডেমিক কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি তোলা হবে,এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ,রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামালকে একাধিক বার কল দেওয়া হলেও ফোন রিসিভ করেননি।

শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..